নিউজবাংলা : কৃষ্ণনগর: শোকাতুর মুহূর্তে মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে চেয়েছিলেন পরিজনেরা। কিন্তু সেই মহতী উদ্যোগের পরিণাম যে হাজতবাস হবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি নদীয়ার কোতোয়ালি থানার সেনপাড়ার শেখ পরিবার। মরণোত্তর চক্ষুদান ঘিরে এক ‘রহ…
নিউজবাংলা : কৃষ্ণনগর: শোকাতুর মুহূর্তে মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে চেয়েছিলেন পরিজনেরা। কিন্তু সেই মহতী উদ্যোগের পরিণাম যে হাজতবাস হবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি নদীয়ার কোতোয়ালি থানার সেনপাড়ার শেখ পরিবার। মরণোত্তর চক্ষুদান ঘিরে এক ‘রহস্যজনক’ অভিযোগের ভিত্তিতে গোটা পরিবারকে গ্রেফতার করল পুলিশ। প্রশাসনের এমন ‘অতিসক্রিয়তায়’ স্তম্ভিত এলাকা। সমাজকর্মীদের আশঙ্কা, এই নজিরবিহীন ঘটনার পর ভবিষ্যতে অঙ্গদান বা দেহদানের মতো মানবিক আন্দোলনে বড়সড় ধাক্কা লাগতে পারে।
ঘটনার সূত্রপাত রবিবার সকালে বার্ধক্যজনিত কারণে প্রয়াত হন রাবেয়া বিবি (৬৫)। তাঁর ছেলে আমির চাঁদ শেখ এলাকায় পরিচিত সমাজকর্মী ও শিক্ষক হিসেবে। মায়ের মৃত্যুর পর শোক সামলে তাঁর কর্নিয়া দানের তোড়জোড় শুরু করেন আমির ও তাঁর পরিজনেরা। লাইসেন্সপ্রাপ্ত সংস্থার কর্মীরা এসে নিয়ম মেনেই কর্নিয়া সংগ্রহ করেন। কিন্তু বিঘ্ন ঘটে এর পরেই।
রশিদ শেখ নামে এক প্রতিবেশী থানায় অভিযোগ দায়ের করেন যে, কোনও মহৎ উদ্দেশ্যে নয়, বরং মোটা টাকার বিনিময়ে মায়ের চোখ ‘বিক্রি’ করে দিয়েছেন ছেলে ও তাঁর পরিবার। তাঁর আরও দাবি, রাবেয়া বিবিকে জীবিত অবস্থায় ঠিকমতো যত্ন করা হতো না।
তদন্তের আগে জেল? অভিযোগ পাওয়া মাত্রই সক্রিয় হয়ে ওঠে পুলিশ। প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখার আগেই আমির চাঁদ শেখ, তাঁর স্ত্রী, ভাই ও দুই বোনকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়। বিচারক তাঁদের তিন দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি, ময়নাতদন্তের জন্য মৃতদেহ পাঠানো হয়েছে কল্যাণী হাসপাতালে। পুলিশের এই ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জেলা বিজ্ঞান মঞ্চের সদস্যরা। তাঁদের দাবি, যেখানে প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং পরিবারের সম্মতি ছিল, সেখানে কেন এমন হয়রানি?
প্রবীণ সমাজকর্মী বিবর্তন ভট্টাচার্য বলেন, "রাবেয়া বিবি নিজে ২০২৪ সালে চক্ষুদানের অঙ্গীকারপত্রে সই করেছিলেন। তাঁর পরিবারের লোকজন সেই ইচ্ছেকে সম্মান জানাতে গিয়ে অপবাদের শিকার হলেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াবে। ভবিষ্যতে কেউ আর এ পথে পা বাড়াতে চাইবেন না।" অন্য এক সমাজকর্মী দীপক রায়ের বক্তব্য, "শুধুমাত্র এক বহিরাগতর সন্দেহের বশে একটি শিক্ষিত পরিবারকে জেলে পোরা হলো। এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে!"
ঘটনাটি জানাজানি হতেই সামাজিক মাধ্যমে নিন্দার ঝড় উঠেছে। নেটিজেনদের একাংশের প্রশ্ন— পুলিশ কি অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই পদক্ষেপ করল? কোনও আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ কি আদৌ মিলেছে? অনেকেই আবার বলছেন, এই কারণেই পরের উপকার করতে নেই, তাহলে এভাবেই শাস্তি পেতে হবে।
আপাতত আইনি লড়াইয়ের পথেই হাঁটছে পরিবারটি। তবে এই ঘটনায় জেলাজুড়ে মরণোত্তর অঙ্গদান আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়ে গেল।
তথ্যসূত্র - এইসময় পত্রিকা
No comments