নিউজবাংলার বিশেষ প্রতিবেদন : ভোটের মুখে শেষ বাজেট অধিবেশনে লক্ষ্মীর ভান্ডারের পরিমান ৫০০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। এরফলে সাধারণ মহিলারা মাসিক ১৫০০ টাকা করে পাবেন, আর এসসি, এসটিরা পাবেন মাসিক ১৭০০ টাকা। …
নিউজবাংলার বিশেষ প্রতিবেদন : ভোটের মুখে শেষ বাজেট অধিবেশনে লক্ষ্মীর ভান্ডারের পরিমান ৫০০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। এরফলে সাধারণ মহিলারা মাসিক ১৫০০ টাকা করে পাবেন, আর এসসি, এসটিরা পাবেন মাসিক ১৭০০ টাকা। এই ঘোষনার পরেই রাজ্য জুড়ে বহু জায়গাতেই আবির মেখে, উৎসবের আমেজে লক্ষ্মীর ভান্ডারকে স্বাগত জানিয়েছেন মহিলারা।
পাল্টা এই প্রকল্পকে কটাক্ষকরেও সমাজ মাধ্যমে সোচ্চার হচ্ছেন অনেকেই। যাদের মতে, চাকরীর আকাল, সরকারী কর্মচারীদের চাহিদামতো ডিএ'র দাবী না মিটিয়ে কেন দান খয়রাতি সে প্রশ্নও তুলছেন অনেকে। আর যারা রাজ্যের বিরোধী মুখ হিসেবে পরিচিত তাঁরা এই লক্ষ্মীর ভান্ডারকে কটাক্ষ করতে পিছপা হচ্ছেন না। একঝলকে দেখে নেওয়া যাক কি বলছে রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি।
আসলে বাংলার রাজনীতির ময়দানে গত কয়েক বছর ধরে এই একটি শব্দবন্ধ সবথেকে বেশি চর্চিত— 'লক্ষ্মীর ভান্ডার'। কেউ একে 'উন্নয়নের কারিগর' হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ একে 'রাজকোষের বোঝা' বা 'খয়রাতি' বলে বিদ্রুপ করছেন। কিন্তু রাজনীতির তর্জা সরিয়ে অর্থনীতির বাস্তব চশমায় চোখ রাখলে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র ধরা পড়ে।
একসময় গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড ছিল ১০০ দিনের কাজ। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সেই প্রকল্পের টাকা বন্ধ থাকায় গ্রাম বাংলার মানুষের হাতে নগদ জোগানে টান পড়েছিল। নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলো যখন প্রায় অচল হতে বসেছিল, ঠিক তখনই 'লক্ষ্মীর ভান্ডার'-এর টাকা গ্রামীণ বাজারে রক্ত সঞ্চালনের কাজ করেছে।
অর্থনীতির একটি সাধারণ সূত্র হলো, টাকা যখন ঘোরে, তখনই বাজারের শ্রীবৃদ্ধি হয়। সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণী বা সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে বাড়তি টাকা এলে তা সাধারণত সোনা, জমি কেনা বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ হয়। এই টাকা দীর্ঘ সময়ের জন্য 'অন্ধকূপে' বন্দি হয়ে যায়, যা প্রতিদিনের খুচরো বাজারে কোনো প্রভাব ফেলে না।
কিন্তু লক্ষ্মীর ভান্ডারের ৫০০ বা ১০০০ টাকা হাতে পাওয়া মাত্রই একজন গ্রামীণ মহিলা সেটি নিয়ে ছোটেন স্থানীয় মুদি দোকান বা সবজি বাজারে। এই টাকা সরাসরি খুচরো বাজারের ছোট ব্যবসায়ীদের হাতে পৌঁছে যায়। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। যাকে তাত্ত্বিকভাবে 'খয়রাতি' বলা হচ্ছে, বাস্তবে তাই আজ প্রান্তিক বাজারের 'অক্সিজেন'।
লক্ষ্মীর ভান্ডারের প্রভাব এতটাই গভীর যে, যারা একসময় একে 'ভিক্ষার ঝুলি' বলে বিদ্রুপ করেছিলেন, আজ তারাই ক্ষমতায় এলে ভাতার অঙ্ক তিনগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বিজেপির মতো দলগুলো অন্য রাজ্যেও এই মডেল অনুকরণ করতে বাধ্য হচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, এই টাকা যদি সত্যিই 'অসম্মানজনক' হতো, তবে বাংলার কোটি কোটি মহিলা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাম নথিভুক্ত করতে লাইনে দাঁড়াতেন না। এটি আজ কেবল একটি সরকারি অনুদান নয়, বরং গ্রামীণ মহিলাদের স্বনির্ভরতা ও মর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শহরের মধ্যবিত্তের মধ্যেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ হলো করভার লাঘব। জলকর থেকে সম্পত্তি কর বা অন্যান্য ট্যাক্স—রাজ্য সরকার সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক বোঝা চাপায়নি। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন নীতি যখন আমজনতার পকেটে টান দিচ্ছে, তখন রাজ্যের এই জনমুখী প্রকল্পগুলো মানুষের কাছে বড় ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লক্ষ্মীর ভান্ডার কেবল একটি নির্বাচনী গিমিক বা দান নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক ঢাল, যা বিশ্বমন্দা বা আঞ্চলিক মন্দার সময়েও বাংলার গ্রামীণ বাজারকে টিকিয়ে রেখেছে। বিরোধীরা যখন এই প্রকল্পের ভুল ধরছেন, সাধারণ মানুষ তখন নিঃশব্দে মুখ্যমন্ত্রীকে আশীর্বাদ করছেন। কারণ তাঁরা জানেন, দুর্দিনে এই 'ভান্ডার'-ই তাঁদের ঘর এবং বাজার—দুটোকেই বাঁচিয়ে রেখেছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের একাংশ ডিএ বা অন্যান্য দাবিতে ক্ষুব্ধ থাকলেও, বাংলার বৃহত্তর জনসমাজ—যাঁরা প্রতিদিনের লড়াইয়ে অভ্যস্ত—তাঁরা কিন্তু দু’হাত ভরে আশীর্বাদ করছেন মুখ্যমন্ত্রীকে। লক্ষ্মীর ভান্ডার কেবল একটি অনুদান প্রকল্প নয়, এটি গ্রামীণ ও শহরতলীর মহিলাদের আত্মসম্মান এবং বেঁচে থাকার রসদ। বিরোধীরা যখন তত্ত্বে ব্যস্ত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন সরাসরি মানুষের হেঁশেলে পৌঁছে গিয়েছেন। আর এখানেই লুকিয়ে আছে তাঁর অপরাজেয় রাজনৈতিক রসায়ন।
- মহিলাদের ক্ষমতায়ন: সরাসরি নারীদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা আসার ফলে গ্রামীণ মহিলাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
- আর্থিক সহায়তা: এটি একটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প, যা মহিলাদের দৈনন্দিন ছোটখাটো খরচ মেটাতে সাহায্য করে।
- ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার উন্নতি: প্রকল্পটির কারণে গ্রামে গ্রামে নতুন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনীতির পরিধি বাড়িয়েছে।
- ভোটব্যাঙ্ক ফ্যাক্টর: বিরোধী দলগুলো (বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম) স্বীকার করে যে, এই প্রকল্পটির জনপ্রিয়তা তৃণমূলের জন্য একটি বড় ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করেছে, যা তাদের (বিরোধীদের) চিন্তার কারণ।
- রাজনৈতিক লড়াই: ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের পর ২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে বিরোধীরাও এই প্রকল্পের টাকার পরিমাণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে পালটা লড়াইয়ে নামছে, যা একে ভোটের লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান উপাদানে পরিণত করেছে।

No comments