শতবর্ষ প্রাচীন ‘রাজা রামচন্দ্র’ নাট্য মন্দির সংস্কার দাঁতনে : এক অনুসন্ধানী শিক্ষকের দীর্ঘ প্রচেষ্টার সাফল্য ! - Newz Bangla

Page Nav

HIDE

Post/Page

Weather Location

Breaking !

latest

শতবর্ষ প্রাচীন ‘রাজা রামচন্দ্র’ নাট্য মন্দির সংস্কার দাঁতনে : এক অনুসন্ধানী শিক্ষকের দীর্ঘ প্রচেষ্টার সাফল্য !

 


নিউজবাংলা ডেস্ক, পশ্চিম মেদিনীপুর : ১৯২৬ সালে নির্মিত তিন-তলা বিশিষ্ট সুবিশাল পেক্ষাগৃহে অভিনয় করে গিয়েছেন নাট্যাচার্য শিশির ভাদুড়ী। কিংবদন্তি সুরকার সচিন দেব বর্মণ, পণ্ডিত যাদবেন্দ্র নন্দন প্রমুখের পদধূলি পড়েছিল এই মঞ্চেই। শোনা যায়, এই নাট্যমঞ্চের আদলেই তিরিশের দশকে মেদিনীপুর শহরের ঐতিহাসিক বিদ্যাসাগর হল নির্মাণ করার প্রচেষ্টা করেন তৎকালীন জেলাশাসক বিনয় রঞ্জন সেন। কিন্তু, এই সমস্ত রোমাঞ্চকর ইতিহাস ছিল ধুলোয় ঢাকা।

ধুলো ঝেড়ে দাঁতনের ঐতিহ্যের অতীতকে আলোকিত করার জন্য নিরলস পরিশ্রম করেছেন পেশায় শিক্ষক তথা আঞ্চলিক ইতিহাসের গবেষক সন্তু জানা। দীর্ঘদিন ধরে দাঁতন তথা প্রাচীন 'দণ্ডভুক্তি' প্রদেশের প্রাচীন ঐতিহাসিক উপাদান রক্ষায় তিনি বদ্ধপরিকর। তাঁর গবেষনায় প্রকাশিত হয়েছে গড়-মনোহরপুরের রাজবাড়ি প্রসঙ্গে বহু অজানা কথা।

তাঁর লেখা গবেষণাগ্রন্থ 'সেকালের দাঁতন: অনালোকিত ৩০০ বছরের কথা ও কাহিনী' উৎসাহী মানুষজনকে রোমাঞ্চিত করেছে। কৌতূহল তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষ থেকে গবেষকমহলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন দণ্ডভুক্তি-একাদেমি রিসার্চ ফাউন্ডেশন।


 

প্রতিনিয়ত প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে গেছেন। সংবাদপত্রে খোলা চিঠি লিখেছেন বহুবার। অবশেষে উদ্যোগী হয় প্রশাসন। নজরে পড়ে পরিত্যক্ত রাজবাড়ির উপর। সকলে মিলে চেষ্টা চলে ইতিহাসকে সংরক্ষণ করার। স্বপ্ন পূরণ হয় এক সাধারণ শিক্ষকের। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই পর্যটকের জন্য খুলে গিয়েছে দাঁতনের ঐতিহ্যবাহী 'রাজা রামচন্দ্র নাট্য মন্দির' -এর দরজা।

প্রসঙ্গতঃ, আজ থেকে প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে ১৫৭৫ সালে সুবর্ণরেখা নদীর তীরে দাঁতনের গ্রামে বেজে উঠেছিল মোঘল-পাঠান মহাযুদ্ধের দামামা। আকবরের সেনাপতি টোডোরমল ও মুনিম খাঁর নেতৃত্বে সুবিশাল মোঘল বাহিনী পর্যুদস্ত করে অত্যাচারী পাঠান নবাব দাউদ খান কররানীকে। বাংলার ইতিহাসে সূচিত হয় এক নতুন যুগ। মোঘল বাহিনীর জনৈক বিজয়ী সেনাধ্যক্ষ লছমিকান্ত সিংহ উত্তর রাও যুদ্ধ শেষে আর দিল্লি ফিরে যাননি। দাঁতনেই থেকে যান।

তিনিই দাঁতন রাজবংশের প্রথম পুরুষ। দিল্লির দরবার থেকে এঁরা বংশ পরম্পরায় লাভ করেছিলেন 'বীরবর' উপাধি। ১৮৪৮ সালে বংশের দ্বাদশ পুরুষ রাজা রামচন্দ্র রায় বীরবর জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে কবি , নাট্যকার ও সমাজসেবক। কলকাতার 'বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ' থেকে সাম্মানিক সদস্যপদ লাভ করেছিলেন তিনি।

১৮৬৮ সালে তাঁর অসামান্য উদ্যোগে দাঁতনে প্রতিষ্ঠিত হয় মিডল-ইংলিশ স্কুল, যা আজকের 'দাঁতন-হাইস্কুল' নামে সর্বজনবিদিত। ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধে তাঁর অদম্য প্রচেষ্টায় দাঁতনের প্রথম দাতব্য চিকিৎসালায় , সাপ্তাহিক হাট , কালিচন্ডী মন্দির , ওড়িশা ট্রাংক রোড সম্প্রসারণ ও মুন্সেফ কোর্ট সংস্কার প্রভৃতি জনকল্যাণ মূলক কাজগুলি সম্পন্ন হয়। রাজা রামচন্দ্র প্রায় ৫০ বছর ধরে নাট্য চর্চায় ব্রতী ছিলে। ১২৮৬ বঙ্গাব্দে গড়ে তোলেন সখের যাত্রাদল। রচনা করেছিলেন অসংখ্য পৌরাণিক পালাগান। 


 

১৯২৬ সালে পিতার স্মৃতি রক্ষার্থে সুরেশ চন্দ্র রায় বীরবর গড়ে তুলেছিলেন এই সুবিশাল নাট্যমঞ্চটি। নিচের তলায় সাজঘর, ওপরে আলোকসজ্জা ও মাঝে ঘূর্ণায়মান মঞ্চে হত মূল অভিনয়। কলকাতার স্টার থিয়েটার ও চিৎপুরের বহু শিল্পীর পদধূলি পড়েছে এইমঞ্চে। প্রতি বছর লোকসমাগমে সম্পন্ন হত নাট্য উৎসব। কিন্তু ১৯৪২ সালের বিধ্বংসী সাইক্লোনে ধূলিসাৎ হয়ে যায় 'রাজা রামচন্দ্র নাট্য মন্দির'।

সম্প্রতি, নাট্য মন্দিরের অবশেষকে সাজিয়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। অতীত ইতিহাস লেখা একটি পাথরের ফলক বসেছে। গবেষক সন্তু জানা বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে দাঁতনের অরক্ষিত ইতিহাস ক্ষেত্রগুলি সংরক্ষণ করার বিষয়ে আবেদন করেছি প্রশাসনের কাছে। অবশেষে আমাদের লড়াই কিছুটা হলেও সফল হল। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সকলের সদিচ্ছাতেই এমনটা সম্ভব হয়েছে। কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই।" দাঁতন-১ পঞ্চায়েত সমিতির উদ্যোগে।

মনোহরপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ব্যবস্থাপনায় ও দণ্ডভুক্তি একাদেমির সহযোগিতায় আয়োজিত স্মৃতি সংরক্ষণ সমারোহে উপস্থিত ছিলেন দাঁতনের বিধায়ক বিক্রম চন্দ্র প্রধান, কেশিয়াড়ির বিধায়ক পরেশ চন্দ্র মুর্মু , দাঁতন-১ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি অনন্ত মান্ডি, সহ-সভাপতি কনক পাত্র , দাঁতন-১ বিডিও চিত্তজিত বসু, রাজবাড়ির ক্সৌনিশ দেবাশীষ রায় বীরবর, তীর্থঙ্কর রায় বীরবর প্রমুখ এবং দণ্ডভুক্তি একাদেমির সদস্যবৃন্দ। দাঁতন-১ বিডিও মঞ্চে তাঁর বক্তব্যে বলেন, "আমাকে উৎসাহিত করার পেছনে যিনি মূল কারিগর তিনি হলেন সন্তু জানা।"

No comments