কলকাতা: দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যে ফাইল ধুলো জমছিল লালফিতের ফাঁসে, অবশেষে তাতে পড়ল রূপোলি রেখা। দীর্ঘদিনের কেন্দ্র-রাজ্য দড়ি টানাটানি আর রাজনৈতিক চাপানউতোরের অবসান ঘটিয়ে গতি পাচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান। ‘বদলের বাংলায়…
কলকাতা: দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যে ফাইল ধুলো জমছিল লালফিতের ফাঁসে, অবশেষে তাতে পড়ল রূপোলি রেখা। দীর্ঘদিনের কেন্দ্র-রাজ্য দড়ি টানাটানি আর রাজনৈতিক চাপানউতোরের অবসান ঘটিয়ে গতি পাচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান।
‘বদলের বাংলায়’ প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটেই মেগা চমক দিলেন রাজ্যের নতুন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। সোমবার বিধানসভায় বাজেট পেশের সময় ঘাটালের দীর্ঘদিনের জলযন্ত্রণা মেটাতে এক লপ্তে ১,২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা করলেন তিনি। দিল্লির ‘ডবল ইঞ্জিন’ সহযোগিতায় এবার সত্যিই কি ঘুচতে চলেছে ঘাটালবাসীর ফি বছরের অভিশাপ? আশার আলো দেখছে আপামর মেদিনীপুর।
জমিদারি বাঁধের ‘অভিশাপ’ ও জলযন্ত্রণা
ভৌগোলিক ভাবেই ঘাটাল মূলত শীলাবতী, কংসাবতী এবং দ্বারকেশ্বর নদের শাখা নদী ঝুমির লীলাভূমি। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আমলে স্থানীয় ভূস্বামীরা বন্যা ঠেকাতে একের পর এক ‘সার্কিট বাঁধ’ তৈরি করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, নিচু এলাকাগুলিকে বাঁচিয়ে আবাদি জমি বাড়ানো।
জমিদারি জমানা ঘুচেছে বহু কাল আগে, কিন্তু রয়ে গিয়েছে সেই নড়বড়ে বাঁধগুলি। উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আজ সেগুলি চূড়ান্ত ভঙ্গুর। বর্ষা এলেই সেই বাঁধ ভেঙে হু হু করে জল ঢোকে লোকালয়ে। উল্টোদিকে, জোয়ারের পলি নদীবাঁধ উপচে ছড়াতে না পেরে জমছে নদীগর্ভেই। ফলে নদীর জলধারণ ক্ষমতা কমছে, আর পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বন্যার দাপট। এই চক্রব্যূহ থেকে ঘাটালকে উদ্ধার করতেই ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের অবতারণা।
দেবের ‘আবদার’ থেকে ছাব্বিশের পালাবদল
ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানকে ঘিরে রাজনীতির জল কম ঘোলা হয়নি। এতদিন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ‘আর্থিক বঞ্চনা’র অভিযোগে সরব ছিল তৎকালীন তৃণমূল সরকার। চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনের আগে এই জলযন্ত্রণা মেটাতে না পারার ‘ব্যর্থতা’ কাঁধে নিয়ে ভোটযুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন ঘাটালের তারকা সাংসদ দেব তথা দীপক অধিকারী।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আসরে নামেন খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আরামবাগের সভামঞ্চে দেবকে পাশে বসিয়ে ঘোষণা করেন, কেন্দ্রের ভরসায় না থেকে রাজ্য নিজের টাকায় ১,৫০০ কোটি ব্যয়ে এই প্রকল্প করবে। দেবের ‘আবদার’ মেনে প্রথম পর্যায়ে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করে কাজও শুরু হয়।
কিন্তু ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে ঘটেছে মহাবর্তন। নবান্নের মসনদে এখন নতুন সরকার। আর নতুন সরকারের প্রথম বাজেটেই স্পষ্ট করে দেওয়া হলো— পূর্বতন সরকারের শুরু করা কাজ মাঝপথে থমকে যাবে না, বরং কেন্দ্রীয় সহযোগিতায় তা আরও গতি পাবে।
কী বলছেন আন্দোলনকারীরা?
বাজেটে এই বিপুল বরাদ্দের ঘোষণাকে দু’হাত তুলে স্বাগত জানিয়েছে ‘ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান রূপায়ণ সংগ্রাম কমিটি’। কমিটির যুগ্ম সম্পাদক নারায়ণ চন্দ্র নায়ক অর্থমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন:
"আমরা এই ঘোষণাকে স্বাগত জানাচ্ছি। তবে অতি দ্রুত আমাদের কমিটির প্রতিনিধি-সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে একটি তদারকি কমিটি গঠন করতে হবে, যাতে মাস্টার প্ল্যানের কাজ সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে রূপায়ণ করা যায়।"
একই সঙ্গে প্রশাসনের উদ্দেশ্যে তাঁর প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি, নদী ও খাল সংস্কারের ক্ষেত্রে যেন কোনো রকম ‘নো কষ্ট’ (No Cost) পদ্ধতি ব্যবহার না করা হয়। ঘাটালবাসীর দাবি, দায়সারা কাজ নয়, বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে নদী ও খালের বাঁধ শক্তপোক্ত করে স্থায়ী সমাধান করা হোক।
১২০০ কোটির এই রাজকীয় বরাদ্দের পর এবার ঘাটালের বানভাসি মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন— এবার কি সত্যিই বর্ষার রূপোলি ইলিশের আনন্দ ম্লান করে দেবে না শীলাবতীর ঘোলা জল? উত্তর লুকিয়ে আছে সময়ের গর্ভেই।

No comments