নিজস্ব সংবাদদাতা, নন্দীগ্রাম: জমি আন্দোলনের ঐতিহাসিক ধাত্রীভূমি নন্দীগ্রাম থেকেই কি তবে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণের মোড় ঘুরে গেল? বিধানসভা উপনির্বাচনের ঘোষিত ফলাফল অন্তত তেমনই জোরালো এক বার্তা দিচ্ছে। ভোটের পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দ…
নিজস্ব সংবাদদাতা, নন্দীগ্রাম: জমি আন্দোলনের ঐতিহাসিক ধাত্রীভূমি নন্দীগ্রাম থেকেই কি তবে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণের মোড় ঘুরে গেল? বিধানসভা উপনির্বাচনের ঘোষিত ফলাফল অন্তত তেমনই জোরালো এক বার্তা দিচ্ছে। ভোটের পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিল— রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলের ওপর থেকে আমজনতার একাংশের আস্থা যেমন টলমল, তেমনই সেই শূন্যস্থানে উত্থান ঘটছে এক নতুন বিরোধী শক্তির। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীতি বনাম বর্তমান তৃণমূল নেতাদের ভাবমূর্তি— এই দ্বন্দ্বে ভর করেই নন্দীগ্রামের মাটি থেকে নতুন রাজনৈতিক শক্তির সমীকরণ স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
পরিসংখ্যানের খাতা খুললে চমকে ওঠার মতোই তথ্য সামনে আসছে। যে হাত প্রতীক চার মাস আগের সাধারণ নির্বাচনে মাত্র ৭৯৪টি ভোট পেয়ে তলানিতে ঠেকেছিল, সেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের বাক্সে এবার উপনির্বাচনে উপচে পড়েছে ৪১,৬৭৪টি ভোট! অথচ প্রতিপক্ষ ছিল শাসকদলের বিপুল প্রচারযন্ত্র, রাজ্য সরকারের 'উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ', একের পর এক সরকারি চাকরির প্রতিশ্রুতি এবং হলদিয়া-নন্দীগ্রাম ব্রিজের বড় ঘোষণা। একসময় যে ডানপন্থী ভোটব্যাঙ্ককে জোড়াফুলের শক্ত ঘাঁটি বলা হতো, তা রাতারাতি সরতে শুরু করেছে হাত চিহ্নের দিকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের এই ট্রেন্ড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল— রাজ্যে যদি তৃণমূলের শক্তি ক্ষয় হয়, তবে সেই অ-বিজেপি ও ডানপন্থী ভোট সটান গিয়ে ঢুকছে কংগ্রেসের ঘরে। তৃণমূলের সর্বস্তরের নেতা-মন্ত্রীদের একাংশের বিরুদ্ধে ওঠা লাগাতার দুর্নীতির অভিযোগে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চরম রূপ নিয়েছে। আর তার ধাক্কাতেই তথাকথিত ‘ঋত’ বা নব্য তৃণমূল নেতাদের সাধারণ মানুষ যে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে, তা নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের ভোটের ফলাফলে দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট।
তৃণমূল মানেই সাধারণ মানুষের কাছে ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতি। কিন্তু দুর্নীতি, সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থবির থাকা, শিক্ষাঙ্গন থেকে স্বাস্থ্য ও সড়ক— সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতিবাজ নেতাদের রমরমা যেভাবে সাধারণ মানুষের মাথাব্যথার কারণ হয়েছিল, তার প্রাথমিক ফায়দা কিছুটা বিজেপি পেলেও, একটা বড় অংশের ভোটার সরাসরি পদ্মশিবিরের দিকে ঝুঁকতে এখনও খানিক দ্বিধাগ্রস্ত। সেই দ্বিধাই এবার নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে শাসকদলের তোলা তথাকথিত সন্ত্রাস ও ছাপ্পার অভিযোগের মধ্যেও বিরোধীদের জন্য এক চিলতে আলোর দিশা নিয়ে এল।
সব মিলিয়ে এই উপনির্বাচন রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন মোড় এনে দিল। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে কংগ্রেসের এই আচমকা মাথাচাড়া দেওয়া নিশ্চিতভাবেই জাতীয় কংগ্রেসের রাজ্য নেতৃত্বকে আগামী দিনের বিধানসভা লড়াইয়ে এক নতুন অক্সিজেন ও বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাবে— এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

No comments