newz Bangla, কলকাতা: রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বিপুল সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অবশেষে গতি আসতে চলেছে। ওবিসি (OBC) সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে বহু আইনি জট কাটতেই নবান্নে জোরকদমে শুরু হয়েছে নতুন নিয়োগের সলতে পাকানোর কাজ। সূত্রের খবর, আ…
newz Bangla, কলকাতা: রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বিপুল সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অবশেষে গতি আসতে চলেছে। ওবিসি (OBC) সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে বহু আইনি জট কাটতেই নবান্নে জোরকদমে শুরু হয়েছে নতুন নিয়োগের সলতে পাকানোর কাজ। সূত্রের খবর, আদালতের বিভিন্ন মামলা প্রত্যাহার এবং সম্প্রতি রাজ্য বিধানসভায় পেশ হওয়া ওবিসি সংশোধনী বিলের দৌলতে এই জটিলতার জট অনেকটাই শিথিল হয়েছে। তবে গত দেড় দশকে শাসকদলের আমলে নিয়োগে লাগামছাড়া দুর্নীতি, ভুঁইফোঁড় অনিয়ম এবং পর্বতপ্রমাণ বেকারত্বের পরিকাঠামোর মুখে দাঁড়িয়ে এই নিয়োগ কতখানি মসৃণ হবে, তা নিয়ে সংশয় ও প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।
সংরক্ষণের আইনি পাকচক্র ও সরকারের পদক্ষেপ
দীর্ঘদিন ধরে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি বা ওবিসি (OBC) সংক্রান্ত আইনি টানাপোড়েনের কারণে রাজ্যে বড় মাপের নিয়োগ প্রায় থমকে ছিল। প্রশাসন সূত্রে খবর, সুপ্রিম কোর্টসহ অন্যান্য আদালতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অন্তত ৬টি গুরুত্বপূর্ণ মামলা রাজ্য সরকার সম্প্রতি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। যার ফলে ওবিসি সংক্রান্ত আইনি জট অনেকটাই কেটেছে।
এর পাশাপাশি, রাজ্য বিধানসভায় পাশ করানো হয়েছে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (আদার দ্যান শিডিউল্ড কাস্টস অ্যান্ড শিডিউল্ড ট্রাইবস) রিজার্ভেশন অব ভ্যাকেন্সিজ ইন সার্ভিসেস অ্যান্ড পোস্টস’ সংশোধনী বিল। হাইকোর্টের রায়ে ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রদান করা ওবিসি শংসাপত্র বাতিল হওয়ার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, এই নতুন আইনের ফলে তাতে বড় পরিবর্তন আসছে। গণ্ডগোলের আওতায় থাকা ১১৩টি জাতিকে ওবিসি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, ফলে তালিকায় বর্তমানে থেকে গিয়েছে ৬৬টি জাতি। এর ফলে আগে যেখানে ওবিসি ‘এ’ ও ‘বি’ মিলিয়ে মোট ১৭ শতাংশ সংরক্ষণ ছিল, তা কমে দাঁড়াল ৭ শতাংশে। এই নতুন মাপকাঠিতেই এখন ঝুলে থাকা সব নিয়োগ-আবেদন বিবেচনার রাস্তা খুলল।
যে সব ক্ষেত্রে নিয়োগের প্রস্তুতি
আইনি বাধা সরতেই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও প্রস্তুতির কাজ দ্রুত শুরু করতে চলেছে নবান্ন:
- বাজেট ঘোষণা: রাজ্য বাজেটে প্রায় ১ লক্ষ শূন্যপদে নিয়োগের যে বড় ঘোষণা হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত করার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
- পঞ্চায়েত ও স্বাস্থ্য: পঞ্চায়েতে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার পদে নিয়োগের ছাড়পত্র দিয়েছে মন্ত্রিসভা। পাশাপাশি স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও বিরাট সংখ্যক কর্মী নিয়োগের পথ পরিষ্কার হচ্ছে।
- ডব্লিউবিসিএস (WBCSS): পাবলিক সার্ভিস কমিশন (PSC) কিছুদিন আগেই ডব্লিউবিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা গ্রহণ করেছে, যেখানে পরীক্ষার্থী ছিলেন লক্ষাধিক। সংশোধনী বিল পাশের পর এখন মেনস (Mains) পরীক্ষায় সংরক্ষণের সমীকরণ ঠিক করতে আইনি পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে।
১৫ বছরের ছায়া: দুর্নীতি, বেকারত্ব ও নিয়োগ খরা
যদিও নবান্ন একে ‘নিয়োগের নতুন দিগন্ত’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, তবুও বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। বিরোধীদের পাশাপাশি রাজ্যজুড়ে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষোভ কিন্তু প্রশমিত হয়নি।
১. লাগামছাড়া দুর্নীতি: গত ১৫ বছরে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির যে নজির তৈরি হয়েছে, তা রাজ্য রাজনীতিতে নজিরবিহীন। শিক্ষক নিয়োগ (SSC, TET), প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ, কিংবা পুরসভার নিয়োগ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই টাকা লেনদেন, সাদা খাতা জমা দেওয়া ও ভুয়ো প্যানেল তৈরির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। রাজ্যের একাধিক হেভিওয়েট মন্ত্রী, বিধায়ক ও শীর্ষ আমলা বর্তমানে জেলবন্দি।
২. বেকারত্বের দাপট: আইনি জটিলতা বা নীতিগত সিদ্ধান্তের অভাবে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজ্য সরকারি পদে নিয়োগ কার্যত বন্ধ ছিল। এর ফলে লক্ষ লক্ষ যোগ্য ও শিক্ষিত যুবক-যুবতীর বয়সসীমা পেরিয়ে গেছে, কিন্তু তাঁরা চাকরি পাননি। পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে ভিনরাজ্যে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা গত ১৫ বছরে রেকর্ড হারে বেড়েছে।
৩. আস্থার সংকট: নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে এখনও গভীর সংশয়ে সাধারণ মানুষ। বহু চাকরিপ্রার্থীর প্রশ্ন—নতুন আইন বা মামলার জট কাটিয়ে যে প্যানেল তৈরি হবে, তাও দুর্নীতির দায়ে পরে ভেস্তে যাবে না তো?
ভবিষ্যতের নির্দেশিকা
প্রশাসনিক মহলের অনুমান, ডব্লিউবিসিএস বাদে বাদবাকি ক্ষেত্রগুলিতে আপাতত আর কোনও আইনি বাধা নেই। দ্রুত বিজ্ঞপ্তি জারি করে আবেদনপত্র গ্রহণের কাজ শুরু করতে চাইছে অর্থ ও কর্মী-প্রশাসন দফতর। তবে দীর্ঘ ১৫ বছরের জমানো ক্ষোভ, হাজার হাজার যোগ্য প্রার্থীর বঞ্চনা আর দুর্নীতির কালিমা মুছে নতুন করে সরকারি প্রক্রিয়ার ওপর আমজনতার ভরসা ফেরানোই এখন নবান্নের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

No comments