নিউজবাংলা, কলকাতা: রাজ্য সরকারি কর্মচারী থেকে শুরু করে আইএএস (IAS), আইপিএস (IPS) এবং ডব্লিউবিসিএস (WBCS) অফিসার— সরকারের অনুমতি ছাড়া সংবাদমাধ্যমে মুখ খুলতে পারবেন না প্রশাসনের কোনও স্তরের কর্মীরাই। এমনকি টেলিভিশন বা রেডিওর আলোচনা…
নিউজবাংলা, কলকাতা: রাজ্য সরকারি কর্মচারী থেকে শুরু করে আইএএস (IAS), আইপিএস (IPS) এবং ডব্লিউবিসিএস (WBCS) অফিসার— সরকারের অনুমতি ছাড়া সংবাদমাধ্যমে মুখ খুলতে পারবেন না প্রশাসনের কোনও স্তরের কর্মীরাই।
এমনকি টেলিভিশন বা রেডিওর আলোচনা সভায় অংশ নেওয়া, সংবাদপত্রে নিবন্ধ লেখা বা সরকারের কোনও নীতির সমালোচনা করার উপরেও জারি করা হল সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা। গত ১৯ মে, ২০২৬ তারিখে রাজ্যের মুখ্যসচিবের দপ্তর থেকে এই মর্মে একটি অত্যন্ত কঠোর এবং নজিরবিহীন সার্কুলার (নম্বর : ১৩৯-সিএস/২০২৬) জারি করা হয়েছে।
নবান্ন সূত্রে খবর, প্রশাসন ও পুলিশ মহলে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং সরকারি নথির গোপনীয়তা রক্ষা করতেই এই কড়া পদক্ষেপ করা হয়েছে। মুখ্যসচিবের পাঠানো এই নির্দেশিকা ইতিমধ্যেই রাজ্যের সমস্ত দপ্তর, জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষকর্তাদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কারা রয়েছেন এই নিষেধাজ্ঞার আওতায়?
মুখ্যসচিবের নির্দেশিকায় স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, এই নিয়ম শুধু নবান্ন বা মহাকরণের শীর্ষ আমলাদের জন্যই নয়, বরং রাজ্যের সিংহভাগ সরকারি ব্যবস্থার ওপর কার্যকর হবে। এর আওতায় থাকছেন :
- অল ইন্ডিয়া সার্ভিসেস (IAS, IPS, IFS)-এর অফিসাররা।
- ডব্লিউবিসিএস (WBCS) এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল পুলিশ সার্ভিসের (WBPS) আধিকারিকরা।
- রাজ্য সরকারের সমস্ত স্তরের সাধারণ কর্মচারী, পুলিশ এবং জেল কর্মী।
- স্বশাসিত সংস্থা, বোর্ড, কর্পোরেশন, সরকারি সংস্থা (Undertakings)।
- রাজ্য সরকারের আর্থিক অনুদানপ্রাপ্ত সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারীবৃন্দ।
নবান্নের ৫ দফা কড়া নির্দেশ ঃ
মুখ্যসচিবের দপ্তরের জারি করা এই সার্কুলারে মূলত পাঁচটি বিষয়ের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বা ‘সেন্সরশিপ’ আরোপ করা হয়েছে:
১) মিডিয়া অনুষ্ঠানে নিষেধাজ্ঞা : সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনও আধিকারিক বা কর্মী বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি কোনও মিডিয়া অনুষ্ঠান বা টক-শো-তে অংশ নিতে পারবেন না। এমনকি ভারত সরকারের স্পনসর করা কোনও অনুষ্ঠান যদি বাইরের সংস্থা তৈরি করে, সেখানেও যোগ দেওয়া যাবে না।
২) তথ্য ফাঁসে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা : সরকারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ ছাড়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংবাদমাধ্যমের কাছে কোনও সরকারি নথি বা তথ্য পাঠানো বা প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৩) নিবন্ধ বা চিঠি লেখায় রাশ : সরকারের আগাম অনুমতি ছাড়া কোনও সংবাদপত্র বা সাময়িকী সম্পাদনা করা, রেডিওর সম্প্রচারে অংশ নেওয়া, অথবা সংবাদপত্রে কোনও নিবন্ধ বা চিঠি পাঠানো যাবে না।
৪) সরকারের সমালোচনা নয় : সংবাদমাধ্যম, লেখালেখি বা জনসমক্ষে দেওয়া কোনও বক্তব্যের মাধ্যমে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের কোনও নীতি বা সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য সমালোচনা করা যাবে না।
৫) সম্পর্ক রক্ষার দায় : এমন কোনও মন্তব্য বা তথ্য প্রকাশ করা যাবে না, যার ফলে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক, অন্য কোনও রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক অথবা কোনও বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তিক্ততা তৈরি হতে পারে।
পুরোনো আইনের কড়া প্রয়োগ ঃ
নবান্নের এই নির্দেশিকায় নতুন কোনও আইন তৈরি করা হয়নি, বরং বিদ্যমান আইনগুলিকেই অত্যন্ত কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সার্কুলারে ১৯৬৮ সালের ‘অল ইন্ডিয়া সার্ভিসেস (কন্ডাক্ট) রুলস’ (বিশেষ করে ধারা ৬, ৭, ১৩ ও ১৭), ১৯৫৯ সালের ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল গভর্নমেন্ট সার্ভেন্টস কন্ডাক্ট রুলস’ এবং ১৯৮০ সালের কর্মচারীদের অধিকার ও বাধ্যবাধকতা সংক্রান্ত রুলসের উল্লেখ করে ‘কঠোর অনুশাসন’ মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে সরকারি তথ্য যেভাবে সংবাদমাধ্যমে চলে আসছিল এবং প্রশাসনের একাংশ যেভাবে প্রকাশ্যে মুখ খুলছিল, তা রুখতেই নবান্নকে এই চরম পদক্ষেপ করতে হল।
আমলাতন্ত্র ও পুলিশ প্রশাসনকে সম্পূর্ণ ‘অরাজনৈতিক’ রাখা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থেই এই নির্দেশিকা বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। তবে এই নির্দেশিকার ফলে সরকারি কর্মচারীদের বাকস্বাধীনতায় কতটা কোপ পড়বে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই অন্দরে চর্চা শুরু হয়েছে।
No comments