নিজস্ব সংবাদদাতা, চণ্ডীপুর: রাজ্যে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। কিন্তু সেই মাহেন্দ্রক্ষণের আগেই রাজনৈতিক রক্তপাতে উত্তপ্ত হয়ে উঠল কলকাতার রাজপথ। চণ্ডীপুরের ‘ঘরের ছেলে’ তথা শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক চন্দ্…
নিজস্ব সংবাদদাতা, চণ্ডীপুর: রাজ্যে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। কিন্তু সেই মাহেন্দ্রক্ষণের আগেই রাজনৈতিক রক্তপাতে উত্তপ্ত হয়ে উঠল কলকাতার রাজপথ। চণ্ডীপুরের ‘ঘরের ছেলে’ তথা শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে খুনের ঘটনায় কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নিল এলাকা।
খুনের নেপথ্যে সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র এবং ‘পেশাদার আততায়ী’দের হাত দেখছে পুলিশ। ক্ষোভে ফুঁসছে বিজেপি নেতৃত্ব। তাদের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীকে ‘শিক্ষা দিতেই’ তাঁর ছায়াসঙ্গীকে সফট টার্গেট করা হয়েছে।
অপারেশন চন্দ্রনাথ: সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানাবে
তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, চন্দ্রনাথকে খুন করা কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং এর পিছনে ছিল দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা। বুধবার রাতে নিজাম প্যালেস থেকে মধ্যমগ্রামের বাড়িতে ফেরার পথে চন্দ্রনাথের গাড়ি আটকানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশি সূত্র অনুযায়ী:
- পথ অবরোধ: একটি প্রাইভেট গাড়ি ও বাইক দিয়ে চন্দ্রনাথের পথ আটকায় দুষ্কৃতীরা।
- পেশাদারিত্ব: খুনিরা এতটাই নিখুঁত যে চোখের পলকে গুলি চালিয়ে তারা এলাকা ছেড়ে চম্পট দেয়।
- বাইক রহস্য: সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে, আততায়ীদের বাইকে কোনও নম্বর প্লেট ছিল না।
- নিশানা: পুলিশের দাবি, খুনিরা সম্ভবত ভাড়টে ‘শার্প শ্যুটার’। প্রশাসনের রদবদল ও শপথের ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে গোয়েন্দা নজরদারির ফাঁকফোকরকেই তারা হাতিয়ার করেছে।
চন্দ্রনাথের মৃত্যুর খবর পৌঁছাতেই চণ্ডীপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় জনরোষ আছড়ে পড়ে। রাতভর চলে দফায় দফায় বিক্ষোভ:
১. চণ্ডীপুর: ১১৬-বি দিঘা-নন্দকুমার জাতীয় সড়ক অবরোধ করে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখান বিজেপি কর্মীরা। দীর্ঘক্ষণ যানজটে আটকে পড়ে বহু গাড়ি। পরে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
২. মহিষাদল: হলদিয়া-মেচেদা রাজ্য সড়কেও আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যায়। খুনিদের গ্রেফতারের দাবিতে উত্তাল হয় এলাকা।
"এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কেউ রেহাই পাবে না। রাজনৈতিক সন্ত্রাসের বলি হওয়া প্রত্যেকের পাশে দল আছে।" — শুভেন্দু অধিকারী
রাজ্যের ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ (ডিজি)-র নেতৃত্বে বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়েছে। তদন্তকারীরা মূলত দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন:
- টাওয়ার লোকেশন: ঘটনার সময় ওই এলাকায় কোন কোন মোবাইল নম্বর সক্রিয় ছিল, তার তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।
- সিসিটিভি ফুটেজ: আশপাশের সমস্ত ক্যামেরার ফুটেজ খুঁটিয়ে দেখে আততায়ীদের পালানোর রুট ম্যাপ তৈরির চেষ্টা চলছে।
চন্দ্রনাথের পারিবারিক তথ্য
চন্দ্রনাথের বাবা দীর্ঘদিন আগেই পরলোকগমন করেছেন। মা হাসিরানী রথ একসময় তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্য থাকলেও বর্তমানে সপরিবারে বিজেপিতে। ছেলের এই আকস্মিক মৃত্যুতে ঈশ্বরপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কুলুপ গ্রাম এখন শোকে পাথর। রাজনৈতিক মহলের মতে, ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানোর ‘বদলা’ নিতেই কি শুভেন্দুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই কর্মীকে সরিয়ে দেওয়া হল? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে চণ্ডীপুরের অলিগলিতে।
আপাতত পুলিশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ— এই খুনের নেপথ্যে থাকা সেই ‘বড় মাথা’ কারা, তা প্রকাশ্যে আনা। নচেৎ শপথের আগে এই রক্তপাত নতুন সরকারের কাছে আইন-শৃঙ্খলার বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।

No comments