Newz Bangla, কলকাতা: ১ কোটি ৫১ লক্ষ আবেদনের পুঙ্খানুপুঙ্খ স্ক্রুটিনি শেষ। রাজ্যে পথ চলা শুরু করল বহু প্রতীক্ষিত 'অন্নপূর্ণা যোজনা'। আজ, পয়লা জুলাই থেকেই উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি ঢুকতে চলেছে প্রথম কিস্তির টাক…
Newz Bangla, কলকাতা: ১ কোটি ৫১ লক্ষ আবেদনের পুঙ্খানুপুঙ্খ স্ক্রুটিনি শেষ। রাজ্যে পথ চলা শুরু করল বহু প্রতীক্ষিত 'অন্নপূর্ণা যোজনা'। আজ, পয়লা জুলাই থেকেই উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি ঢুকতে চলেছে প্রথম কিস্তির টাকা। ‘হুল দিবস’ উদযাপনে বাঁকুড়ার মুকুটমণিপুরে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে দিলেন, এবার আর 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার'-এর মতো ঢালাও খয়রাতি নয়; কড়া স্ক্রুটিনির মাধ্যমে প্রায় ৩০ লক্ষ 'অযোগ্য' আবেদনকারীকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। কাদের নাম বাদ পড়েছে বিস্তারিত জানতে স্পূর্ণ খবরটি দেখুন।
১ কোটি ২০ লক্ষ দিদি-বোনের নাম নথিভুক্ত, তাঁরা পাচ্ছেন ৩ হাজার টাকা
মুকুটমণিপুরের প্রশাসনিক সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী অন্নপূর্ণা যোজনার প্রথম দফার চূড়ান্ত খতিয়ান প্রকাশ করেন। তিনি ঘোষণা করেন:
"রাজ্যে ১ কোটি ৫১ লক্ষ মানুষ অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য আবেদন করেছিলেন। প্রশাসনের কড়া স্ক্রুটিনির পর আমরা ১ কোটি ২০ লক্ষের বেশি দিদি ও বোনের নাম চূড়ান্ত তালিকায় নথিভুক্ত করতে পেরেছি। আগামীকাল, ১ জুলাই এঁদের প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে সরাসরি ৩,০০০ টাকা করে ট্রান্সফার করা হবে। প্রতি মাসে এই টাকা নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছে যাবে।"
এই ১ কোটি ২০ লক্ষ উপভোক্তার মধ্যে বড় অংশ জুড়েই রয়েছে প্রান্তিক সমাজ। মুখ্যমন্ত্রী জানান, "আপনারা শুনলে খুশি হবেন, এই তালিকায় ৫ লক্ষ আদিবাসী দিদি এবং বোন আছেন। তাঁরাও আগামীকালই তাঁদের ৩,০০০ টাকা পেয়ে যাবেন।"
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বনাম অন্নপূর্ণা যোজনা: টাকার অঙ্কে ডবল, নিয়মে কড়া
তৃণমূল জমানার অতি জনপ্রিয় প্রকল্প ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর নাম ও কাঠামো বদলে নতুন সরকার এনেছে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’। তবে এটি কেবল নামের বদল নয়, দুই প্রকল্পের চরিত্রগত এবং আর্থিক পার্থক্য আকাশপাতাল। নিচে তুলনামূলক খতিয়ান দেওয়া হলো:
|
বৈশিষ্ট্য |
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার (পুরনো প্রকল্প) |
অন্নপূর্ণা যোজনা (নতুন প্রকল্প) |
|---|---|---|
|
মাসিক আর্থিক সাহায্য |
সাধারণের জন্য ১,৫০০ এবং SC/ST-দের জন্য ১,৭০০ টাকা |
জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত যোগ্য মহিলার জন্য ফ্ল্যাট ৩,০০০ টাকা |
|
বার্ষিক বরাদ্দ |
১৮,০০০ থেকে ২০,৪০০ টাকা |
৩৬,০০০ টাকা |
|
যাচাইকরণ বা ভেরিফিকেশন |
শিথিল ও প্রাথমিক স্তর (প্রায় ২.২ কোটি উপভোক্তা ছিলেন) |
অত্যন্ত কড়া (ভোটার তালিকা ও বিশেষ সমীক্ষা 'SIR 2026' মিলিয়ে যাচাই) |
|
আধার সংযোগ (DBT) |
আধার বা ব্যাঙ্ক লিঙ্কিংয়ে শিথিলতা ছিল |
আধার-লিঙ্কড ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যতিরেকে টাকা ঢোকা অসম্ভব |
লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ‘দুর্নীতি’ নিয়ে মন্ত্রীদের তোপ: কারা পাবেন না অন্নপূর্ণার টাকা?
অন্নপূর্ণা যোজনা চালু হতেই পূর্বতন সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প নিয়ে বেনজির দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পল।
মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, "লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে প্রায় ৩০ লক্ষ এমন মানুষ টাকা পাচ্ছিলেন, যাঁরা মৃত, এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছেন কিংবা ভোটার তালিকা থেকেই নাম কাটা গিয়েছে। ভুয়ো উপভোক্তাদের টাকা পাইয়ে সরকারি কোষাগার লুঠ করা হচ্ছিল।" মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পল স্পষ্ট জানান, "লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে ব্যাপক জালিয়াতি ধরা পড়েছে। তাই অন্নপূর্ণা যোজনায় আমরা বাড়তি সতর্কতা নিয়েছি। সরকারি টাকা কোনো মধ্যসত্ত্বভোগী ছুঁতে পারবে না।"
⛔ যে যে কারণে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা মিলবে না:
- আয়কর দাতা: আবেদনকারী মহিলা বা তাঁর পরিবার যদি আয়কর (Income Tax) প্রদান করেন, তবে এই সুবিধা মিলবে না।
- সরকারি চাকরি ও পেনশন: কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার, পঞ্চায়েত, পুরসভা বা সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল-কলেজ) স্থায়ী বা অবসরপ্রাপ্ত কর্মী ও পেনশনাররা এই টাকা পাবেন না।
- ভোটার তালিকায় নাম না থাকা: বিশেষ ভোটার তালিকা সমীক্ষায় (SIR 2026) যাঁদের নাম মৃত, স্থানান্তরিত (Shifted) বা অনুপস্থিত (Absent) হিসেবে কাটা গিয়েছে, তাঁরা তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।
- ব্যাঙ্ক ও আধার জটিলতা: যদি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টটি সিঙ্গল (একক) না হয়ে যৌথ (Joint Account) হয় বা অ্যাকাউন্টের সাথে আধার কার্ড ও NPCI (National Payments Corporation of India) ম্যাপিং না করা থাকে, তবে টাকা আটকে যাবে।
- সরকারী ভ্যাকসিন না নেওয়া : যে সমস্ত মহিলা বাচ্চাদের সরকারী পোলিও, টিকা দেন না সেই মায়েদের নাম ফাইনাল তালিকায় জায়গা নাও পেতে পারে।
- সরকারী স্কুলে না পড়া : যাদের বাচ্চা সরকারী স্কুলে পড়াশোনা করে না সেই সমস্ত মায়েদের নামও ফাইনাল স্ক্রুটিনিতে বাদ পড়ার আশংকা রয়েছে।
ব্যতিক্রমী ছাড়: তবে সিএএ (CAA) আবেদনকারী বা ট্রাইব্যুনালে মামলা বিচারাধীন থাকা মহিলাদের ক্ষেত্রে এখনই টাকা বন্ধ হচ্ছে না, মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা এই সুবিধা পাবেন।
আজ থেকে কারা পাবেন আর কারা পাবেন না: এক নজরে
কারা পাচ্ছেন?
পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা, ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী সেইসব সাধারণ, তপশিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত মহিলারা—যাঁদের নাম কড়া প্রশাসনিক স্ক্রুটিনির পর ১ কোটি ২০ লক্ষের ফাইনাল তালিকায় উঠেছে এবং যাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সম্পূর্ণ অ্যাক্টিভ রয়েছে।
কারা পাচ্ছেন না?
১ কোটি ৫১ লক্ষ আবেদনকারীর মধ্যে যে ৩০ লক্ষ মহিলার আবেদন বাতিল হয়েছে—যাঁরা সরকারি চাকুরিজীবী, আয়কর দাতা কিংবা ভোটার তালিকার ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েছেন, তাঁরা আজ থেকে এই ৩,০০০ টাকার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলেন।
নবান্ন সূত্রে খবর, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সম্পূর্ণ তৈরি থাকলে কাল সকাল থেকেই মোবাইল ফোনে টাকা ঢোকার মেসেজ আসা শুরু হয়ে যাবে।
গ্রাউন্ড রিপোর্ট কি বলছে?
অন্নপূর্ণায় আবেদনকারী বহু মহিলার অভিযোগ, সরকারী নিয়ম নীতিকে উপেক্ষা করে প্রকৃত পক্ষে ফিল্ড ভেরিফিকেশান ছাড়াই উপভোক্তার তালিকা তৈরী হয়েছে। কারা এই টাকা পাওয়ার তালিকায় জায়গা পেলেন, কারা পেলেন না তার সুষ্পষ্ট তালিকা প্রকাশের দাবীও জানাচ্ছেন অনেকেই। কারও নাম বাদ গেলে তার নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ থাকলে পরবর্তীকালে তাঁরা পুনরায় আবেদন করতে পারবেন কিনা সে বিষয়টিও স্পষ্ট হওয়া দরকার।
বিশেষতঃ যারা লাইন দিয়ে পঞ্চায়েত বা ব্লকে অফলাইনে ফর্ম জমা করেছিলেন সেগুলো আদৌ এন্ট্রি হয়েছে কিনা সেই প্রশ্নও ঘুরছে অনেকের মনে। সব মিলিয়ে আশংকা আর উদ্বেগের দোলাচলে রয়েছেন মহিলারা। কার টাকা ঢুকবে ও কার ঢুকবে না তা নিয়েই এখন আলোচনা তুঙ্গে।

No comments